
ইসলামি ইবাদতব্যবস্থায় তাহাজ্জুদ এমন এক নফল ইবাদত, যা বান্দা ও রবের মাঝে গভীর আত্মিক সংযোগ সৃষ্টি করে। রাতের নিস্তব্ধতা, নিভৃত পরিবেশ ও একান্ত উপস্থিতি—এই তিনটি উপাদান একত্রে তাহাজ্জুদকে পরিণত করে এক জ্যোতির্ময় সাধনায়। এটি কেবল অতিরিক্ত কোনো নামাজ নয়; বরং আত্মশুদ্ধি, নৈতিক উৎকর্ষ এবং আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের এক কার্যকর আধ্যাত্মিক মাধ্যম। তাহাজ্জুদ শব্দহীন—তবু প্রভাবশালী; নীরব—তবু আলোড়ন সৃষ্টিকারী। যখন রাত গভীর হয়, কোলাহল থেমে যায়, পৃথিবী ঘুমের অতলে তলিয়ে যায়—ঠিক তখনই কিছু সৌভাগ্যবান বান্দা আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে শয্যা ত্যাগ করে দাঁড়িয়ে যায় তাঁর দরবারে। এই দাঁড়ানো কোনো সাধারণ দাঁড়ানো নয়; এটি রবের সামনে আত্মসমর্পণের এক অনুপম দৃশ্য। আল কুরআনের আলোকে তাহাজ্জুদ পবিত্র কুরআনুল কারিমে তাহাজ্জুদের গুরুত্ব অত্যন্ত গভীরভাবে তুলে ধরা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় রাসূল ﷺ-কে নির্দেশ দিয়ে বলেন— “রাতের কিছু অংশে তাহাজ্জুদ আদায় কর; এটি তোমার জন্য অতিরিক্ত ইবাদত। আশা করা যায়, তোমার প্রতিপালক তোমাকে এক প্রশংসিত মর্যাদায় উন্নীত করবেন।” (সূরা আল-ইসরা, ১৭:৭৯)
আরেক স্থানে আল্লাহ বলেন— “তাদের পার্শ্বদেশ শয্যা থেকে আলাদা থাকে; তারা ভয় ও আশার সঙ্গে তাদের প্রতিপালককে ডাকে।” (সূরা আস-সাজদাহ, ৩২:১৬) এছাড়াও বলা হয়েছে— “তারা রাত্রিতে অল্পই নিদ্রা যেত এবং শেষ প্রহরে তারা ক্ষমা প্রার্থনা করত।” (সূরা আয-যারিয়াত, ৫১:১৭–১৮) হাদিসের আলোকে তাহাজ্জুদ রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন— “ফরজ নামাজের পর সর্বোত্তম নামাজ হলো রাতের নামাজ।” (সহিহ মুসলিম: ১১৬৩) অন্য হাদিসে এসেছে— “রাতের শেষ তৃতীয়াংশে আল্লাহ তাআলা দুনিয়ার আকাশে অবতরণ করেন এবং বলেন—কে আছে আমার কাছে দোয়া করবে, আমি তার দোয়া কবুল করব।” (সহিহ বুখারি: ১১৪৫; সহিহ মুসলিম: ৭৫৮)
নবী, সাহাবি ও সালাফে সালেহিনদের জীবনে তাহাজ্জুদ
রাসূলুল্লাহ ﷺ রাতের পর রাত তাহাজ্জুদে দাঁড়িয়ে থাকতেন, এমনকি তাঁর পা মোবারক ফুলে যেত। সাহাবায়ে কেরাম ও পরবর্তী যুগের মনীষীদের জীবনেও তাহাজ্জুদ ছিল আত্মশুদ্ধির প্রধান মাধ্যম। তাঁদের দিনের সম্মান ও ইলমের গভীরতার পেছনে ছিল রাতের কান্না ও সিজদা। তাহাজ্জুদের বহুমাত্রিক প্রভাব
তাহাজ্জুদ মানুষের অন্তরকে পরিশুদ্ধ করে, অহংকার ভেঙে দেয় এবং আল্লাহর ওপর পূর্ণ নির্ভরতা সৃষ্টি করে। এটি মানসিক প্রশান্তি আনে, দুশ্চিন্তা কমায় এবং জীবনের সিদ্ধান্তে প্রজ্ঞা দান করে। যে ব্যক্তি রাতের শেষ ভাগে আল্লাহর সামনে দাঁড়ায়, আল্লাহ তার দিনের প্রতিটি পদক্ষেপে বরকত দান করেন। তাহাজ্জুদের সময় এশার ফরজ নামাজের পর থেকে ফজরের আগ পর্যন্ত সময় তাহাজ্জুদের সময়। তবে সর্বোত্তম ও অধিক ফজিলতপূর্ণ সময় হলো রাতের শেষ অংশ। কেউ যদি শেষ রাতে উঠতে না পারে, তবে এশার পর ঘুমের আগে তাহাজ্জুদের নিয়তে দু-চার রাকাত আদায় করলেও তা তাহাজ্জুদ হিসেবে গণ্য হবে ইনশাআল্লাহ। হৃদয়ের আহ্বান তাহাজ্জুদ কঠিন ইবাদত নয়; কঠিন হলো নিয়মিত হওয়া। কিন্তু যে মানুষ আল্লাহর জন্য রাত জাগে, আল্লাহ তার জন্য দিনের সব পথ সহজ করে দেন। হয়তো আজ দু’রাকাত দিয়েই শুরু—কিন্তু কাল সেটিই আপনার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে।
লেখক, গবেষক ও ইসলামী চিন্তাবিদ
গবেষণা বিভাগীয় প্রধান
আল হেরা গ্লোবাল এডুকেশন ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ
Probaho News24 — প্রবাহিত হোক তথ্য, উন্মোচিত হোক সত্য।