
তারাগঞ্জে এক ইউনিয়নের তিন বানান, এক হাটের চার বানান: সরকারি নথিতেই চরম অসঙ্গতি, বিভ্রান্তিতে জনসাধারণ
বুলবুল হোসেন, তারাগঞ্জ (রংপুর) প্রতিনিধি:
রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার একটি গুরুত্বপূর্ণ জনপদের নামের বানান নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলছে চরম বিভ্রান্তি। একই ইউনিয়ন ও একই হাটের নাম সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ড, রাস্তার নামফলক, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নামফলক, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ড এমনকি সরকারি দপ্তরের নথিপত্রেও ভিন্ন ভিন্নভাবে লেখা হয়েছে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, একটি ইউনিয়নের নাম তিনটি এবং একটি হাটের নাম চারটি ভিন্ন বানানে ব্যবহৃত হচ্ছে। ফলে সাধারণ মানুষ, শিক্ষার্থী, চাকরিপ্রার্থী, গবেষক, সাংবাদিক ও বহিরাগতদের মধ্যে প্রকৃত সরকারি বানান নিয়ে তৈরি হয়েছে ব্যাপক বিভ্রান্তি।
সরেজমিনে অনুসন্ধানে দেখা যায়, তারাগঞ্জ উপজেলার হাড়িয়ার কুঠি ইউনিয়নের নাম বিভিন্ন স্থানে “হাড়িয়ার কুঠি”, “হাড়িয়ার কুটি” এবং “হাড়িয়ালকুঠি”—এই তিনটি বানানে লেখা হয়েছে। একইভাবে ডাঙ্গীরহাট বাজারের নামও চারটি ভিন্ন বানানে ব্যবহৃত হচ্ছে। কোথাও “ডাঙ্গীরহাট”, কোথাও ” ডাঙ্গিরহাট “, কোথাও “ডাংগীরহাট”, আবার কোথাও “ডাংগিরহাট” লেখা রয়েছে।শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই এ অসঙ্গতির স্পষ্ট চিত্র দেখা যায়। ডাঙ্গীরহাট স্কুল অ্যান্ড কলেজের নামফলকে লেখা রয়েছে “ডাঙ্গীরহাট”। অথচ একই মাঠে অবস্থিত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রবেশপথে লেখা হয়েছে “ডাংগীরহাট”। একই স্থানে অবস্থিত দুটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে একই এলাকার নাম দুই ধরনের বানানে ব্যবহৃত হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে—প্রকৃত বানান কোনটি?ডাঙ্গীরহাট বাজারের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ডেও একই চিত্র দেখা যায়। কোথাও “ডাঙ্গিরহাট বাজার”, আবার কোথাও “ডাংগিরহাট বাজার” লেখা হয়েছে। ফলে বাজারের সরকারি নাম সম্পর্কেও সাধারণ মানুষের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
শুধু বেসরকারি প্রতিষ্ঠান নয়, সরকারি সংস্থার স্থাপনাতেও একই ধরনের অসঙ্গতি রয়েছে। সড়ক ও জনপথ বিভাগের স্থাপিত বামনদিঘী-ডাঙ্গীরহাট সড়কের বিভিন্ন নামফলকে কোথাও “ডাঙ্গিরহাট”, আবার কোথাও “ডাংগীরহাট” লেখা হয়েছে। একই সরকারি বিভাগের বিভিন্ন সাইনবোর্ডে একই স্থানের একাধিক বানান ব্যবহারে বিভ্রান্তি আরও বেড়েছে।
অনুসন্ধানের সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য মিলেছে হাড়িয়ার কুঠি ইউনিয়ন ভূমি অফিসে। সরকারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে ভূমি অফিসে কোনো এলাকার সঠিক ও অভিন্ন সরকারি বানান সংরক্ষিত থাকার কথা থাকলেও সেখানে বিভিন্ন সরকারি নথিতে একই ইউনিয়ন ও একই হাটের নাম একাধিক বানানে লেখা হয়েছে।
হাড়িয়ার কুঠি ইউনিয়ন ভূমি অফিসে সংরক্ষিত নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০০৭ সালের হাটের পেরিফেরি নকশায় বাজারটির নাম “ডাংগীরহাট” উল্লেখ রয়েছে। একই বছরের ২৮ জানুয়ারি তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সাইফুল আলম স্বাক্ষরিত পেরিফেরি ম্যাপ অনুমোদন নোটিশে ইউনিয়নের নাম “হাড়িয়ার কুটি” এবং বাজারের নাম “ডাঙ্গীরহাট” লেখা হয়েছে।
কিন্তু মাত্র এক বছর পর, ২৫ জানুয়ারি ২০০৮ তারিখে একই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সাইফুল আলম স্বাক্ষরিত যৌথবাহিনীর সহায়তায় পরিচালিত উচ্ছেদ অভিযানের নথিতে ইউনিয়নের নাম পরিবর্তিত হয়ে “হাড়িয়ারকুটি” এবং বাজারের নাম “ডাঙ্গিরহাট” লেখা হয়।অসঙ্গতি এখানেই শেষ নয়। ১২ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মোনাব্বর হোসেন স্বাক্ষরিত হাট-বাজার ইজারার দরপত্র আহ্বান বিজ্ঞপ্তিতে ইউনিয়নের নাম “হাড়িয়ার কুঠি” এবং বাজারের নাম “ডাংগীরহাট” লেখা হয়েছে। অন্যদিকে, হাড়িয়ার কুঠি ইউনিয়ন ভূমি উপসহকারী কর্মকর্তা মো. রবিউল সিদ্দিকীর নামফলকে ইউনিয়নের নাম লেখা রয়েছে “হাড়িয়ার কুটি”। অর্থাৎ একই দপ্তরেই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার স্বাক্ষরিত নথি ও কর্মকর্তার নামফলকে ভিন্ন বানান ব্যবহৃত হয়েছে।
অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে পার্শ্ববর্তী হাড়িয়ার কুঠি ইউনিয়ন পরিষদেও সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, তাদের বিভিন্ন নথিতে ইউনিয়নের নাম “হাড়িয়ার কুঠি” এবং বাজারের নাম “ডাঙ্গীরহাট” লেখা রয়েছে। অর্থাৎ পাশাপাশি অবস্থিত দুটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের সরকারি নথিতেই একই ইউনিয়ন ও একই বাজারের নাম ভিন্ন ভিন্ন বানানে ব্যবহৃত হচ্ছে।
স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের মতে, একটি এলাকার সরকারি নাম একাধিক বানানে লেখা হলে প্রশাসনিক নথি, ভূমি রেকর্ড, শিক্ষা, গণমাধ্যম, ডিজিটাল তথ্যভান্ডার, মানচিত্র প্রণয়ন এবং সরকারি সেবাদানে জটিলতা সৃষ্টি হওয়া স্বাভাবিক। ভবিষ্যতে তথ্য সংরক্ষণ ও নথিপত্র ব্যবস্থাপনায়ও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
ভাষাবিদদের মতে, বাংলা বানানরীতি অনুযায়ী কোনো স্থাননামের একটি প্রমিত ও সরকারি বানান নির্ধারিত থাকলে সেটিই সর্বত্র অনুসরণ করা উচিত। সরকারি প্রতিষ্ঠানের নামফলক, রাস্তার সাইনবোর্ড, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নথি এবং সরকারি-বেসরকারি সব প্রকাশনায় একই বানান ব্যবহার নিশ্চিত করা ভাষার শুদ্ধ চর্চা ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলার জন্য অপরিহার্য।
স্থানীয়দের দাবি, উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে ভূমি রেকর্ড, মৌজা মানচিত্র, পুরোনো সরকারি গেজেট, ডাক বিভাগের নথি এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি রেকর্ড যাচাই করে ইউনিয়ন ও হাটের প্রকৃত সরকারি বানান নির্ধারণ করতে হবে। এরপর জেলা প্রশাসন, শিক্ষা বিভাগ, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি), সড়ক ও জনপথ বিভাগ, ভূমি বিভাগ, ইউনিয়ন পরিষদসহ সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানে একই বানান ব্যবহারের নির্দেশনা বাস্তবায়ন করতে হবে।
এ সম্পর্কে ডাঙ্গীরহাট স্কুল এন্ড কলেজের সহকারি অধ্যাপক মোঃ ছদেকুল ইসলাম বলেন, “একটি স্থানের নাম শুধু একটি শব্দ নয়; এটি সেই অঞ্চলের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাই স্থাননামের সঠিক ও অভিন্ন বানান নিশ্চিত করা ভাষার মর্যাদা রক্ষা, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা বজায় রাখা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নির্ভুল তথ্যভান্ডার গড়ে তোলার স্বার্থে অত্যন্ত জরুরি।”
দীর্ঘদিনের এই বিভ্রান্তির অবসানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেবে—এমনটাই প্রত্যাশা স্থানীয় বাসিন্দাদের।