
স্টাফ রিপোর্টার,মোঃ আলমগীর কবির
উত্তরের সীমান্তবর্তী জেলা ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ–রাণীশংকৈল নিয়ে গঠিত ঠাকুরগাঁও–৩ সংসদীয় আসনে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক সমীকরণ এবার ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে। এখানে লড়াই কেবল দল বনাম দলের নয়, বরং দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদদের সঙ্গে এক স্বপ্নবাজ তরুণ নেতৃত্বের মুখোমুখি অবস্থান। এই আসনে স্বতন্ত্র ও বিভিন্ন দলের মিলিয়ে প্রায় ১০ জন প্রার্থী থাকলেও মাঠের বাস্তবতায় মূল প্রতিযোগিতা ঘুরপাক খাচ্ছে চার প্রার্থীর মধ্যে। তারা হলেন—বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য জাহিদুর রহমান জাহিদ, জামায়াতে ইসলামীর মিজানুর রহমান মাস্টার (দুইবারের সফল উপজেলা চেয়ারম্যান), জাতীয় পার্টির পাঁচবারের সাবেক সংসদ সদস্য হাফিজ উদ্দিন আহম্মেদ এবং গণঅধিকার পরিষদের তরুণ প্রার্থী মামুনুর রশিদ মামুন। দীর্ঘদিন ধরে এই আসনের রাজনীতি দুই প্রধান ধারায় আবর্তিত হলেও এবারের নির্বাচনে নতুন রাজনৈতিক শক্তির দৃশ্যমান উপস্থিতি ভোটের অঙ্ককে অনিশ্চিত করে তুলেছে।
পরিচিত মুখ বনাম নতুন প্রত্যাশা
বিএনপির প্রার্থী জাহিদুর রহমান জাহিদ এই এলাকার রাজনীতিতে সুপরিচিত মুখ। দলীয় কাঠামো, অভিজ্ঞ কর্মী ও নির্বাচনী নেটওয়ার্ক তাঁর শক্তি। ২০১৮ সালের বিতর্কিত নির্বাচনে তিনি নির্বাচিত হয়ে সারা দেশে আলোচনায় আসেন। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর মিজানুর রহমান মাস্টারের রয়েছে আদর্শভিত্তিক সংগঠিত ভোটব্যাংক এবং দীর্ঘ নির্বাচনী অভিজ্ঞতা। জাতীয় পার্টির হাফিজ উদ্দিন আহম্মেদ পাঁচবারের সংসদ সদস্য হিসেবে ভোটের মাঠে অভিজ্ঞ হলেও স্থানীয়দের মতে, বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় জাতীয় পার্টির সাংগঠনিক শক্তি তুলনামূলক দুর্বল। এই অভিজ্ঞ ও প্রবীণ রাজনীতিবিদদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে নতুন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছেন গণঅধিকার পরিষদের তরুণ প্রার্থী মামুনুর রশিদ মামুন। তিনি ভর করছেন তরুণ ভোটার, প্রথমবার ভোট দিতে যাওয়া নাগরিক এবং রাজনীতিতে হতাশ একটি বড় জনগোষ্ঠীর ওপর।
তরুণদের আস্থা, সংখ্যালঘুদের ভরসা
স্থানীয়দের মতে, মামুনুর রশিদ মামুন তরুণদের পাশাপাশি হিন্দু সম্প্রদায়ের মাঝেও আস্থার প্রতীক হয়ে উঠেছেন। দীর্ঘদিন ধরে যারা নির্যাতন, মামলা ও হয়রানির শিকার হয়েছেন, তাদের কাছে তিনি নতুন আশার আলো হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন।
পীরগঞ্জ উপজেলার সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলে উঠে এসেছে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ ও বঞ্চনার চিত্র। তারা বলেন, “স্বাধীনতার ৫৫ বছরে অনেক নেতা দেখেছি, উন্নয়ন হয়েছে ঠিকই, কিন্তু আমাদের মতো কৃষিনির্ভর গরিব মানুষের ভাগ্যের তেমন পরিবর্তন হয়নি।” আরেকজন বলেন, “রাস্তাঘাট, হাসপাতাল, কৃষি—কোনো জায়গাতেই মৌলিক পরিবর্তন দেখি না। সার সংকট লেগেই থাকে।”
স্থানীয়দের বক্তব্যে দলীয় পরিচয়ের চেয়ে যোগ্য প্রতিনিধির প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট।
“দল বড় কথা না, দরকার এমন এমপি যিনি থানায় গিয়েও কথা বলতে পারবেন, আবার ঢাকায় গিয়েও এলাকার পক্ষে দাঁড়াতে পারবেন।” আরেকজনের ভাষায়, “রাজনীতি এখন টাকা আর প্রভাবের খেলা। মামুনের বয়স কম, কিন্তু সে অন্তত আমাদের মতো কথা বলে।”
মামুনুর রশিদ মামুন কেন আলাদা
মামুনুর রশিদ মামুনের সবচেয়ে বড় শক্তি তাঁর সাহসিকতা ও সরল যোগাযোগ। যদিও বড় দলগুলোর মতো শক্তিশালী নির্বাচনী কাঠামো তাঁর নেই, তবু তরুণদের একটি বড় অংশ পুরোনো রাজনৈতিক বৃত্ত ভাঙতে আগ্রহী।
ভোটাররা কি আবারও পরিচিত ধারায় ফিরবেন, নাকি ঝুঁকি নিয়ে নতুন কাউকে সুযোগ দেবেন?
ভোটার উপস্থিতি যদি বেশি হয়, বিশেষ করে তরুণদের অংশগ্রহণ বাড়ে, তাহলে এই আসনে মামুনুর রশিদ মামুন বাস্তব প্রতিযোগিতায় শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারেন। ঠাকুরগাঁও–৩ আসনের এবারের নির্বাচন কেবল একজন সংসদ সদস্য নির্বাচনের লড়াই নয়। এটি মূলত এই জনপদের মানুষ কী ধরনের রাজনীতি চায়, তার একটি গণভোট।
নিরাপদ কিন্তু পুরোনো ধারা, নাকি অনিশ্চিত হলেও নতুন প্রত্যাশা—সেই রায়ই দেবে ব্যালট বাক্স।
Probaho News24 — প্রবাহিত হোক তথ্য, উন্মোচিত হোক সত্য।