
ফেনীর নবনিযুক্ত এসপি মাহবুব আলম খানকে ঘিরে সামাজিক মাধ্যমে বিভ্রান্তিকর প্রচারণা
আবু বক্কর ছিদ্দিক স্টাফ রিপোর্টার ফেনী
অভিযোগের সময় ঢাকায় সরকারি প্রশিক্ষণে ছিলেন—নথিপত্রে মিলেছে স্পষ্ট প্রমাণ
ফেনী জেলার সদ্য দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ সুপার (এসপি) মোঃ মাহবুব আলম খানকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কয়েকটি অনলাইন প্ল্যাটফর্মে সম্প্রতি একটি পুরোনো অভিযোগ নতুন করে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
তবে সংশ্লিষ্ট সরকারি নথিপত্র, প্রশিক্ষণ সংক্রান্ত রেকর্ড এবং প্রশাসনিক তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, অভিযোগে উল্লেখিত সময় তিনি ঘটনাস্থলে ছিলেন না; বরং ঢাকায় সরকারি প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ করছিলেন।
বিষয়টি ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ধরনের বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে পড়ায় সচেতন মহলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যাচাই ছাড়া এমন অভিযোগ প্রচার একজন সরকারি কর্মকর্তার ব্যক্তিগত ও পেশাগত সুনাম ক্ষুণ্ন করতে পারে।
অভিযোগ ও বাস্তবতার মধ্যে মিল নেই
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত অভিযোগে দাবি করা হয়, ২০১৬ সালের আগস্ট মাসে চাঁপাইনবাবগঞ্জে সংঘটিত একটি ঘটনায় মাহবুব আলম খানের সম্পৃক্ততা ছিল।
কিন্তু অনুসন্ধানে পাওয়া সরকারি নথিপত্রে দেখা যায়, ওই সময় তিনি ঢাকায় পুলিশ স্টাফ কলেজ বাংলাদেশে প্রশিক্ষণে ছিলেন।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, তিনি ২০১৬ সালের ১৪ আগস্ট থেকে ১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ঢাকায় অনুষ্ঠিত “30th Police Financial Management Certificate Course”-এ অংশগ্রহণ করেন। অভিযোগে উল্লেখিত ঘটনাটির তারিখ ১৭ আগস্ট ২০১৬, যা ওই প্রশিক্ষণকালীন সময়ের মধ্যেই পড়ে।
এতে অভিযোগের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সরকারি নথিতে যা পাওয়া গেছে
এই প্রতিবেদকের হাতে আসা পুলিশ স্টাফ কলেজ বাংলাদেশের অফিসিয়াল নথিতে সংশ্লিষ্ট প্রশিক্ষণ কোর্সে অংশগ্রহণকারী কর্মকর্তাদের তালিকায় মোঃ মাহবুব আলম খানের নাম স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে।
শুধু তাই নয়, প্রশিক্ষণ শেষে তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে “Release Certificate” প্রদান করা হয়েছে বলেও নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, সরকারি প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণকারী কর্মকর্তাদের উপস্থিতি ও কার্যক্রম কঠোর প্রশাসনিক নিয়মের আওতায় সংরক্ষণ করা হয়। ফলে ওই সময় তিনি ঢাকায় অবস্থান করছিলেন—এ তথ্য প্রশাসনিকভাবে যাচাইযোগ্য।
অভিযোগের টাইমলাইনে স্পষ্ট অসংগতি
নথিপত্র বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, অভিযোগের সময়রেখা ও সরকারি তথ্যের মধ্যে স্পষ্ট অসামঞ্জস্য রয়েছে।
সময়রেখা বিশ্লেষণ
১৪ আগস্ট ২০১৬ — ঢাকায় পুলিশ স্টাফ কলেজে প্রশিক্ষণ শুরু
১৭ আগস্ট ২০১৬ — অভিযোগে উল্লেখিত ঘটনার তারিখ
১ সেপ্টেম্বর ২০১৬ — প্রশিক্ষণ সমাপ্তি
এই সময়রেখা অনুযায়ী, অভিযোগের দিন তিনি ঢাকাতেই প্রশিক্ষণে অংশ নিচ্ছিলেন। ফলে ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকার দাবি বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
দীর্ঘ সময় চট্টগ্রামে দায়িত্ব পালন
পুলিশ প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, মোঃ মাহবুব আলম খান ২০২২ সালের ২০ নভেম্বর চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশে (সিএমপি) উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) হিসেবে বদলি হয়ে যোগদান করেন।
পরবর্তীতে ২০২২ সাল থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত তিনি দীর্ঘ সময় চট্টগ্রামেই দায়িত্ব পালন করেন। প্রশাসনিক সূত্র বলছে, সাম্প্রতিক বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পরিস্থিতিতেও তিনি চট্টগ্রাম এলাকায় দায়িত্বে ছিলেন, যা প্রশাসনিক রেকর্ডের মাধ্যমে যাচাই করা সম্ভব।
পদোন্নতি ও দায়িত্ব নিয়েও আলোচনা
পুলিশ প্রশাসনের একাধিক সূত্র জানায়, কর্মজীবনে তিনি একাধিকবার পদোন্নতি বঞ্চিত হয়েছেন বলে অভ্যন্তরীণভাবে আলোচনা রয়েছে।
এছাড়া পুলিশ সুপার (এসপি) পদে পদোন্নতি পেলেও দীর্ঘ সময় তাকে কোনো গুরুত্বপূর্ণ জেলার দায়িত্ব দেওয়া হয়নি বলেও জানা যায়।
সংশ্লিষ্টদের মতে, যদি তিনি রাজনৈতিকভাবে বিশেষ কোনো মহলের ঘনিষ্ঠ হতেন, তাহলে আগের সরকার আমলেই তাকে জেলার পুলিশ সুপার হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব দেওয়া হতে পারত।
যাচাই ছাড়া তথ্য প্রচারে উদ্বেগ
সচেতন নাগরিক ও গণমাধ্যম সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যাচাই-বাছাই ছাড়া তথ্য ছড়িয়ে দেওয়ার প্রবণতা বর্তমানে উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে।
একজন সচেতন নাগরিক বলেন,
“মানুষ গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যকে সহজেই বিশ্বাস করে। তাই কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ প্রকাশের আগে সঠিক তথ্য যাচাই করা অত্যন্ত জরুরি।”
তাদের মতে, কোনো সরকারি কর্মকর্তা বা ব্যক্তির বিরুদ্ধে অসম্পূর্ণ কিংবা বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার হলে তা শুধু ব্যক্তিগত সুনাম নয়, প্রশাসনের প্রতিও জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে।
বর্তমানে ফেনীর পুলিশ সুপার
সর্বশেষ প্রশাসনিক তথ্য অনুযায়ী, মোঃ মাহবুব আলম খান বর্তমানে ফেনী জেলার পুলিশ সুপার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
সংশ্লিষ্ট মহলের অভিমত, সামনে আসা সরকারি নথিপত্র, প্রশিক্ষণ রেকর্ড এবং সময়রেখা বিশ্লেষণ করলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অভিযোগগুলোর সত্যতা নিয়ে যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে, তা সহজেই অনুধাবন করা সম্ভব।
তারা বলছেন, দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা ও তথ্য যাচাইয়ের সংস্কৃতি জোরদার না হলে ভবিষ্যতেও এ ধরনের বিভ্রান্তিকর প্রচারণা সমাজে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।