
বুলবুল হোসেন, তারাগঞ্জ (রংপুর) প্রতিনিধি:
বেতন নেই, সরকারি নিয়োগ নেই, নেই কোনো সুযোগ-সুবিধা। তবুও প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত ব্যস্ত মহাসড়কে দাঁড়িয়ে মানুষের নিরাপত্তায় কাজ করে যাচ্ছেন শফিকুল ইসলাম শফি। রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে প্রায় তিন বছর ধরে স্বেচ্ছায় এই দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। স্থানীয়দের কাছে তিনি পরিচিত ‘বিনা বেতনের মানবিক ট্রাফিক পুলিশ’ হিসেবে।
রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার সৈয়দপুর-রংপুর মহাসড়কের খিয়ার জুম্মা এলাকাটি অত্যন্ত ব্যস্ত। প্রতিদিন অসংখ্য যানবাহন চলাচল করায় এ এলাকায় প্রায়ই ঘটত সড়ক দুর্ঘটনা। চোখের সামনে এসব দুর্ঘটনা ও মানুষের দুর্ভোগ দেখে একসময় মানুষের জীবন রক্ষায় নিজ উদ্যোগে সড়কে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন শফি।
এরপর থেকে প্রতিদিন সকাল হলেই হাতে ইশারা দিয়ে যানবাহন নিয়ন্ত্রণ, পথচারীদের নিরাপদে রাস্তা পার হতে সহযোগিতা এবং চালকদের সতর্ক করার কাজে নেমে পড়েন তিনি। দীর্ঘ সময় ধরে এভাবে দায়িত্ব পালন করলেও এর বিনিময়ে কোনো বেতন বা সরকারি সুবিধা পান না তিনি।
শফিকুল ইসলাম শফি তারাগঞ্জ উপজেলার ১ নম্বর আলমপুর ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের খিয়ার জুম্মা বাজার এলাকার বাসিন্দা। তার বাবা এছার উদ্দিন মাহমুদ। ছয় সন্তানের জনক শফি নিজেও অভাব-অনটনের মধ্যে জীবনযাপন করেন। নিজের সংসারের কষ্ট থাকলেও অন্যের নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দিয়ে যাচ্ছেন তিনি।
শফির এই মানবিক উদ্যোগের আরও একটি দিক হৃদয় ছুঁয়ে যায়। দায়িত্ব পালনের পোশাকটিও তার নিজের নয়। এক পুলিশ সদস্যের কাছ থেকে পোশাক ধার করে এবং ফায়ার সার্ভিসের এক কর্মকর্তার কাছ থেকে জুতা ধার নিয়ে মহাসড়কে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। নিজের সামর্থ্য সীমিত হলেও মানুষের সেবার ইচ্ছায় কোনো কমতি নেই তার।
শফিকুল ইসলাম শফি বলেন, “এই জায়গায় আমার চোখের সামনে দুর্ঘটনায় মানুষ মারা যেতে দেখেছি। তাই মানবিক দিক বিবেচনা করে প্রায় তিন বছর ধরে এখানে ট্রাফিকের দায়িত্ব পালন করছি বাহে। মানুষের জীবন বাঁচাতে পারলে আমার ভালো লাগে।”
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, শফি নিয়মিত সড়কে দায়িত্ব পালন শুরু করার পর খিয়ার জুম্মা এলাকায় দুর্ঘটনা অনেকটাই কমেছে। ব্যস্ত মহাসড়কে তার উপস্থিতি পথচারীদের সতর্ক করার পাশাপাশি যানবাহন চলাচল নিয়ন্ত্রণেও সহায়তা করছে। তাদের ভাষ্য, নিজের সংসার চালাতেই যেখানে শফির কষ্ট হয়, সেখানে কোনো পারিশ্রমিক ছাড়াই সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত মানুষের নিরাপত্তায় কাজ করে যাচ্ছেন তিনি।
এ বিষয়ে তারাগঞ্জ হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মোস্তাফিজার বলেন, “শফি আমাদের নিয়োগপ্রাপ্ত কোনো কর্মচারী নন। তবে শুনেছি, তিনি স্বেচ্ছায় খিয়ার জুম্মা এলাকায় দায়িত্ব পালন করেন।”
স্থানীয় দোকান্দার মানিকুল বলেন, শফিকুল ইসলাম শফির মতো স্বেচ্ছাসেবী মানুষের পাশে প্রশাসন ও সমাজের বিত্তবানদের দাঁড়ানো প্রয়োজন। সরকারি বা বেসরকারি সহযোগিতা ও যথাযথ স্বীকৃতি পেলে তিনি আরও উৎসাহ নিয়ে মানুষের সেবায় কাজ করতে পারবেন।
শফি কোনো সরকারি ট্রাফিক পুলিশ নন। তার হাতে নেই সরকারি ক্ষমতা, নেই মাস শেষে বেতন পাওয়ার নিশ্চয়তা। এমনকি দায়িত্ব পালনের পোশাক ও পায়ের জুতাটিও ধার করা। তবুও মানুষের জীবন রক্ষার দায়িত্ব থেকে পিছিয়ে যাননি তিনি।প্রতিদিন হাজারো মানুষ যখন এই মহাসড়ক দিয়ে নিজ নিজ গন্তব্যে ছুটে যায়, তখন তাদের নিরাপত্তার জন্য নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন শফি। তার এই কাজ হয়তো কোনো সরকারি খাতায় লেখা নেই, কিন্তু স্থানীয় মানুষের মনে তৈরি হয়েছে ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার জায়গা। নিজের অভাবের মধ্যেও অন্যের নিরাপত্তার কথা ভাবা শফির এই নিঃস্বার্থ উদ্যোগ যেন মনে করিয়ে দেয়—মানবিকতার জন্য বড় পদ বা বড় সামর্থ্যের প্রয়োজন হয় না; প্রয়োজন শুধু মানুষের জন্য কিছু করার ইচ্ছা।