
পবিত্র মাহে রমজান কেবল উপবাসের মাস নয়, এটি মূলত তাকওয়া অর্জন ও আল্লাহ্র নৈকট্য লাভের এক মহোৎসব। এই মাসকে বলা হয় ‘ইবাদতের বসন্তকাল’। তাই রমজান আসার আগেই ইবাদতের জন্য একটি সুপরিকল্পিত প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি।
নিচে রমজানের ইবাদতের প্রস্তুতির বিস্তারিত দিকগুলো আলোচনা করা হলো:
১. তাওবা ও নিয়ত বিশুদ্ধ করা (মানসিক প্রস্তুতি)
রমজানের প্রথম প্রস্তুতিই হলো অন্তরকে কলুষমুক্ত করা।
তাওবা-ইস্তিগফার: বিগত জীবনের সকল গুনাহের জন্য আল্লাহ্র কাছে কায়মনোবাক্যে ক্ষমা চেয়ে অন্তরকে পরিষ্কার করতে হবে। গুনাহমুক্ত মন নিয়ে রমজান শুরু করলে ইবাদতে মনোযোগ বাড়ে।
খাঁটি নিয়ত: লোক দেখানো নয়, বরং শুধুমাত্র আল্লাহকে খুশি করার জন্য রোজা রাখার নিয়ত এখন থেকেই করতে হবে।
মন পরিষ্কার করা: কারো প্রতি হিংসা, বিদ্বেষ বা শত্রুতা থাকলে তা মিটিয়ে ফেলতে হবে। আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন থাকলে তা জোড়া লাগাতে হবে, কারণ হিংসুক ও সম্পর্ক ছিন্নকারীর ইবাদত কবুল হওয়ার ক্ষেত্রে বাধা থাকে।
২. কুরআনের সাথে সম্পর্ক গড়ার পরিকল্পনা
রমজান হলো কুরআন নাজিলের মাস। তাই এই মাসে কুরআনের হক আদায় করা সবচেয়ে জরুরি।
খতমের পরিকল্পনা: পুরো মাসে কতবার কুরআন খতম দেবেন, তার একটি ছক তৈরি করুন। যেমন—প্রতি নামাজের পর ৪ পৃষ্ঠা পড়লে দিনে ২০ পৃষ্ঠা (১ পারা) পড়া হয়, এতে ৩০ দিনে ১ খতম সহজেই সম্পন্ন হয়।
অর্থ ও তাফসির পাঠ: শুধু রিডিং না পড়ে কুরআনের অর্থ ও ব্যাখ্যা (তাফসির) পড়ার জন্য দিনের একটি নির্দিষ্ট সময় বরাদ্দ রাখুন।
তিলাওয়াত শুদ্ধ করা: যদি তিলাওয়াতে ভুল থাকে, তবে রমজানের আগেই কোনো কারী বা অভিজ্ঞ কারো কাছ থেকে সুরাগুলো শুদ্ধ করে নিন।
৩. নামাজের বিশেষ প্রস্তুতি
জামাতে নামাজ: এখন থেকেই পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ জামাতের সাথে আদায়ের অভ্যাস গড়ে তুলুন।
তারাবিহর প্রস্তুতি: দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে তারাবিহ পড়ার জন্য শারীরিক ও মানসিকভাবে প্রস্তুত হোন। কোন মসজিদে পড়বেন বা খতম তারাবিহ নাকি সূরা তারাবিহ পড়বেন, তা ঠিক করে নিন।
তাহাজ্জুদের অভ্যাস: সাহরি খাওয়ার জন্য যেহেতু উঠতেই হবে, তাই সাহরির সময়ের ২০ মিনিট আগে উঠে তাহাজ্জুদ পড়ার অভ্যাস করার এটিই সেরা সুযোগ।
৪. দোয়া ও জিকিরের রুটিন
রমজানে প্রতিটি মুহূর্ত দামী। তাই সময় অপচয় রোধে জিহ্বাকে সিক্ত রাখতে হবে জিকিরে।
দোয়া মুখস্থ করা: রমজান ও রোজার গুরুত্বপূর্ণ দোয়াগুলো (ইফতার, সাহরি, তারাবিহ) এবং দৈনন্দিন জীবনের মাসনুন দোয়াগুলো রিভিশন দিয়ে নিন।
বিশেষ সময়ের দোয়া: ইফতারের আগ মুহূর্তে এবং শেষ রাতে আল্লাহ দোয়া কবুল করেন। এই সময়গুলোতে নিজের, পরিবারের ও মুসলিম উম্মাহর জন্য কী কী চাইবেন, তার একটি তালিকা আগেই তৈরি করে রাখতে পারেন।
জিকির: চলতে-ফিরতে ‘সুবহানাল্লাহ’, ‘আলহামদুলিল্লাহ’, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’, ‘আল্লাহু আকবার’ পড়ার অভ্যাস করুন।
৫. সময় ব্যবস্থাপনা ও ডিজিটাল ডিটক্স
রমজানের বরকত থেকে বঞ্চিত হওয়ার অন্যতম কারণ হলো সময়ের অপচয়।
রুটিন তৈরি: অফিস বা ব্যবসার পাশাপাশি কখন কুরআন পড়বেন, কখন ঘুমাবেন এবং কখন পরিবারের কাজে সাহায্য করবেন—তার একটি লিখিত রুটিন তৈরি করুন।
সোশ্যাল মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ: ফেসবুক, ইউটিউব বা অহেতুক স্ক্রলিং থেকে নিজেকে বিরত রাখার প্রতিজ্ঞা করুন। স্মার্টফোন ব্যবহারের সময় কমিয়ে সেই সময়টা ইবাদতে লাগান।
৬. দান-সদকা ও যাকাতের হিসাব
রাসূল (সা.) রমজান মাসে প্রবাহিত বাতাসের চেয়েও বেশি দানশীল হয়ে যেতেন।
যাকাত হিসাব করা: আপনি যদি নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হন, তবে রমজানে যাকাত দিলে সওয়াব বেশি পাওয়া যায়। তাই আগেই সম্পদের হিসাব করে যাকাতের পরিমাণ নির্ধারণ করুন।
প্রতিদিন দান: সাধ্যমতো প্রতিদিন কিছু না কিছু দান করার চেষ্টা করুন, তা যত অল্পই হোক। গরিব-দুঃখী ও এতিমদের ইফতার করানোর পরিকল্পনা করুন।
৭. শারীরিক প্রস্তুতি ও খাদ্যাভ্যাস
সুস্থ শরীর ইবাদতের জন্য অপরিহার্য।
পরিমিত আহার: ইফতার ও সাহরিতে অতিরিক্ত ভাজাপোড়া বা গুরুপাক খাবার পরিহার করুন, যাতে তারাবিহ বা ইবাদতে অলসতা না আসে।
ঘুমের রুটিন: রাতে তাড়াতাড়ি ঘুমানোর অভ্যাস করুন যাতে সাহরিতে উঠতে কষ্ট না হয়।
৮. পারিবারিক প্রস্তুতি
পরিবারের সদস্যদের, বিশেষ করে শিশুদের রোজার প্রতি উৎসাহিত করুন।
গৃহিণীরা ঈদের কেনাকাটা বা রান্নার কাজগুলো গুছিয়ে রাখার চেষ্টা করুন যাতে রমজানের শেষ দশকে ইবাদতে বেশি সময় দেওয়া যায় (লাইলাতুল কদরের তালাশে)।
সারকথা:
রমজান বছরে একবারই আসে। এই মাসটি যেন হেলায়-ফেলায় না কাটে, সেজন্য শাবান মাস থেকেই আমাদের প্রস্তুতি শুরু করা উচিত। আল্লাহ আমাদের সবাইকে রমজানের পূর্ণ হক আদায় করে ইবাদত করার তৌফিক দান করুন। আমিন।