
সাংবাদিকতা: পরিচয়ের নয়, দায়িত্ব, নৈতিকতা ও আইনের বিষয়—কপি-পেস্ট নয়, সত্য অনুসন্ধানই প্রকৃত সাংবাদিকতা।
মোঃমাহফুজুর রহমান মোর্শেদ।
বান্দরবান জেলা প্রতিনিধি;
সাংবাদিকতা কোনো পদবি নয়, এটি একটি সাংবিধানিক দায়িত্ব ও জনস্বার্থে পরিচালিত একটি পেশা। শুধুমাত্র একটি ফেসবুক পেজ পরিচালনা, অন্যের সংবাদ কপি করে প্রকাশ করা বা নিজেকে “সাংবাদিক”, “রিপোর্টার” কিংবা “গণমাধ্যমকর্মী” পরিচয় দিলেই কেউ প্রকৃত সাংবাদিক হয়ে যান না। একজন সাংবাদিকের পরিচয় তাঁর পেশাগত সততা, তথ্য যাচাই, নিরপেক্ষতা এবং জনস্বার্থে দায়িত্বশীল ভূমিকার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদ প্রত্যেক নাগরিকের চিন্তা, বিবেক, মতপ্রকাশ এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দিয়েছে। তবে একই সঙ্গে এই স্বাধীনতা রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, বিদেশি রাষ্ট্রের সঙ্গে সুসম্পর্ক, জনশৃঙ্খলা, শালীনতা, নৈতিকতা, আদালত অবমাননা, মানহানি এবং অপরাধে প্ররোচনার মতো বিষয়ের ক্ষেত্রে আইন দ্বারা যুক্তিসঙ্গতভাবে সীমিত করা যেতে পারে।
বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিল আইন, ১৯৭৪ অনুযায়ী প্রতিষ্ঠিত প্রেস কাউন্সিল সাংবাদিকতার মান, নৈতিকতা ও দায়িত্বশীলতা রক্ষায় কাজ করে। প্রেস কাউন্সিলের সাংবাদিকদের আচরণবিধি অনুসারে—
সংবাদ প্রকাশের আগে যথাসম্ভব তথ্য যাচাই করতে হবে।
অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য নেওয়ার আন্তরিক চেষ্টা করতে হবে।
গুজব, অপপ্রচার বা যাচাইবিহীন তথ্যকে সংবাদ হিসেবে প্রকাশ করা যাবে না।
সংবাদে সত্যতা, নিরপেক্ষতা, ভারসাম্য ও জনস্বার্থ বজায় রাখতে হবে।
সাংবাদিকতার অন্যতম মৌলিক নীতি হলো “Audi Alteram Partem”—অর্থাৎ অন্য পক্ষকেও শোনো। তাই কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রকাশের আগে বাদী, বিবাদী বা অভিযুক্তসহ সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করা ন্যায্য সাংবাদিকতার অপরিহার্য অংশ।
কপিরাইট আইন, ২০২৩ অনুযায়ী অন্যের মৌলিক লেখা, সংবাদ, আলোকচিত্র বা সৃজনশীল কাজ অনুমতি ছাড়া নিজের নামে প্রকাশ করা বা ব্যবহার করা কপিরাইট লঙ্ঘনের শামিল হতে পারে এবং এতে দেওয়ানি ও ফৌজদারি—উভয় ধরনের আইনগত জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে।
সাইবার নিরাপত্তা আইন, ২০২৩ অনুযায়ী অনলাইনে এমন কোনো তথ্য প্রকাশ বা প্রচার করা, যা মিথ্যা, বিকৃত, প্রতারণামূলক বা আইনবিরোধী উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয় এবং যার মাধ্যমে ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা জনস্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, সেক্ষেত্রে আইনগত দায়বদ্ধতার প্রশ্ন উঠতে পারে। তাই অনলাইন সাংবাদিকতা বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রেও তথ্য যাচাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এছাড়া বাংলাদেশ দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ৪৯৯ ও ৫০০ ধারায় মানহানির বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে। মিথ্যা বা যাচাইবিহীন অভিযোগ প্রকাশের মাধ্যমে কারও সুনাম ক্ষুণ্ন হলে, আইনগত প্রতিকার চাওয়ার সুযোগ রয়েছে।
সাংবাদিকতা কখনোই কেবল পরিচয়পত্র, ফেসবুক আইডি, ইউটিউব চ্যানেল বা একটি অনলাইন পেজের নাম নয়। সাংবাদিকতা হলো তথ্য সংগ্রহ, প্রমাণ যাচাই, সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য গ্রহণ এবং জনগণের জানার অধিকার নিশ্চিত করার একটি দায়িত্বশীল ও নৈতিক প্রক্রিয়া।@