
মোঃ মাহফুজুর রহমান মোর্শেদ,বান্দরবান
বান্দরবানের পার্বত্য জেলার লামা উপজেলার সরই ইউনিয়নের বনাঞ্চল রাতের আঁধারে ভয়াবহ পরিবেশ বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। সন্ধ্যার পর থেকেই সক্রিয় হয়ে ওঠে অবৈধ কাঠ ও জ্বালানি কাঠ পাচারের শক্তিশালী সিন্ডিকেট চক্র। স্থানীয় বনাঞ্চল থেকে বান্দরবান ও চট্টগ্রামের সীমান্তবর্তী ইটভাটাগুলোর দিকে নির্বিঘ্নে চলাচল করছে কাঠবোঝাই গাড়ি। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রতিটি লাকড়ী বোঝাই গাড়ি থেকে ৪০০ টাকা এবং কাঠ বোঝাই গাড়ি থেকে ১৫০০ টাকা করে চাঁদা আদায় করা হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, এই অবৈধ কার্যক্রম পরিচালনায় বন বিভাগের কয়েকজন কর্মকর্তার নাম ভাঙিয়ে পাচার চালানো হচ্ছে। বিশেষ করে ডলু ছড়ি রেঞ্জের কেয়াজুপাড়া বিট কর্মকর্তা আব্দুল করিমের নাম ব্যবহার করে সিন্ডিকেটটি দীর্ঘদিন ধরে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, লুলাইং ও মেরাইত্তাসহ আশপাশের বনাঞ্চল দিন-রাত নির্বিচারে উজাড় করা হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, বন বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কিছু কর্মচারী অর্থের বিনিময়ে এই অবৈধ সিন্ডিকেটকে সরাসরি সহায়তা করছেন। যারা কাঠ পাচার বন্ধ করার কথা, তারাই চাঁদা নিয়ে পাচারকারীদের জন্য পথ সুগম করছেন। বন সংরক্ষণের নামে বাগান সৃজনকারীরা নিজ বাগানের গাছ ঘর-বাড়ির প্রয়োজনে কাটতেও বাধার মুখে পড়ছেন। ফরেস্ট মামলার ভয় দেখিয়ে হয়রানির অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে, মান্দার আমলের জটিল বন আইন প্রয়োগ করে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের অভিযোগও উঠেছে। জোত পারমিটের নামে একাধিক বাগান থেকে গাছ কেটে তা বৈধ দেখানোর চেষ্টা চলছে, যা বাস্তবে অবৈধ কাঠ পাচারের একটি ঢাল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। পরিবেশবিদরা বলছেন, বন উজাড়, পাহাড় ন্যাড়া করা ও অবৈধ পাথর উত্তোলনের ফলে পার্বত্য এলাকার প্রাকৃতিক ভারসাম্য দ্রুত নষ্ট হচ্ছে। এতে জীববৈচিত্র্য ধ্বংস, পাহাড়ি পানির উৎস শুকিয়ে যাওয়া, মাটি ক্ষয় এবং স্থানীয় জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি বাড়ছে। একজন পরিবেশবিদ বলেন, “ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন নিয়ন্ত্রণ আইন-২০১৩ অনুযায়ী ইটভাটায় জ্বালানি হিসেবে কাঠ ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। আইনের ১৪(৬) ধারায় স্পষ্টভাবে কাঠ ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হলেও বাস্তবে এই আইন কার্যকর হচ্ছে না। ইটভাটাগুলো নির্বিচারে জ্বালানি কাঠ ব্যবহার করছে, যা ভয়াবহ পরিবেশগত হুমকি।” স্থানীয় বাসিন্দা নিজাম উদ্দিন বলেন,
“বন বিভাগের অসাধু কর্মকর্তারাই কাঠ পাচারে জড়িত। আমরা বারবার নজরদারির দাবি জানিয়েছি, কিন্তু কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।” সাম্প্রতিক সময়ে হাইকোর্টের রায় বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে লামার ইটভাটাগুলোতে অভিযান শুরু হলেও ইটভাটা মালিক ও শ্রমিকদের বাধায় কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হয়। কাঠ ছাড়া ইটভাটা চালানো সম্ভব নয়—এই অজুহাতে অবৈধ কাঠ ব্যবহার অব্যাহত রয়েছে। পরিবেশবাদীরা আশঙ্কা করছেন, দ্রুত অবৈধ কাঠ পাচার বন্ধ না হলে বান্দরবানের বনাঞ্চল সম্পূর্ণভাবে উজাড় হয়ে যাবে। এতে পাহাড়ি জনপদের জীবনযাত্রা, কৃষি, পানির নিরাপত্তা ও সামগ্রিক পরিবেশ মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়বে। স্থানীয় সচেতন মহল দাবি করেছেন—
অবৈধ কাঠ পাচার সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে
বন বিভাগের দায়বদ্ধতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে
জোত পারমিট ব্যবস্থার অপব্যবহার বন্ধ করতে হবে
আইন অনুযায়ী ইটভাটায় কাঠ ব্যবহার সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করতে হবে
বান্দরবান পার্বত্য অঞ্চলের বন ও পরিবেশ রক্ষায় এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এই বিপর্যয় দীর্ঘমেয়াদে আরও ভয়াবহ রূপ নেবে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
Probaho News24 — প্রবাহিত হোক তথ্য, উন্মোচিত হোক সত্য।