
আব্দুল জলিল পাশা, উপজেলা প্রতিনিধি, সাটুরিয়া, মানিকগঞ্জ
মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া উপজেলার ফুকুরহাটি ইউনিয়নের জান্না বাজারে সার নিয়ে কৃষকদের সঙ্গে প্রতারণার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় সার ব্যবসায়ী সানোয়ারের মালিকানাধীন ভাই ভাই এন্টারপ্রাইজের বিরুদ্ধে। নিম্নমানের বা মাটির তৈরি সারকে এক নম্বর ডিআইবি সার হিসেবে বিক্রি করার অভিযোগ করেছেন স্থানীয় কৃষকরা।
কৃষকদের অভিযোগ, জান্না বাজারের ওই ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে কেনা সার হাতে নিয়ে ডলা দিলে মাটির মতো পদার্থ বের হচ্ছে। আবার পানিতে ভিজিয়ে দিলে সার না হয়ে কাদার মতো হয়ে যাচ্ছে। ফলে জমিতে প্রয়োগ করার পর কাঙ্ক্ষিত ফলন না পাওয়ার আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন কৃষকরা।
স্থানীয় কৃষকদের দাবি, দীর্ঘদিনের কষ্ট ও অর্থ ব্যয় করে তারা জমিতে ফসল উৎপাদন করেন। কিন্তু ভালো মানের সারের পরিবর্তে নিম্নমানের বা ভেজাল সার সরবরাহ করা হলে একদিকে যেমন তাদের সরাসরি আর্থিক ক্ষতি হবে, অন্যদিকে ফসল উৎপাদনও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে। এ ঘটনায় জান্না গ্রামের শত শত কৃষক ক্ষতির মুখে পড়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
কৃষকদের আরও অভিযোগ, সারের বস্তা বা প্যাকেটের গায়ে যে মান উল্লেখ করা হচ্ছে, বাস্তবে সার পরীক্ষা করে তার সঙ্গে মিল পাওয়া যাচ্ছে না। তাই তারা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে সারগুলো দ্রুত পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করে প্রকৃত মান যাচাই এবং অভিযোগের সত্যতা তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
আগেও বেশি দামে সার বিক্রির অভিযোগ
ব্যবসায়ী সানোয়ারের বিরুদ্ধে এর আগেও সরকারি নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে সার বিক্রির অভিযোগ উঠেছিল বলে স্থানীয়দের দাবি। অভিযোগ রয়েছে, সরকারি দামের বাইরে প্রতি বস্তায় প্রায় ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা বেশি নেওয়া হতো।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, এসব অভিযোগের প্রমাণ পাওয়ার পর সাটুরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কাজী মোহাম্মদ অনিক ইসলাম ওই ব্যবসায়ীকে ২ লাখ টাকা জরিমানা করেন। এর আগেও তার বিরুদ্ধে একাধিকবার জরিমানা করার অভিযোগ রয়েছে।
কৃষকদের অভিযোগ, একাধিকবার ব্যবস্থা নেওয়ার পরও যদি একই ধরনের অভিযোগ আবার ওঠে, তাহলে বিষয়টি আরও কঠোরভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন। কীভাবে একই ব্যবসায়ী বারবার সার বিক্রির সুযোগ পাচ্ছেন, তার পেছনে কোনো প্রভাব বা অনিয়ম রয়েছে কি না—সেটিও খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন তারা।
রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর অভিযোগ
স্থানীয়দের কেউ কেউ অভিযোগ করেছেন, সানোয়ার রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা পরিচালনা করে আসছেন। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। অভিযুক্ত ব্যবসায়ী বা সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে।
কৃষকদের দাবি, রাজনৈতিক বা অন্য কোনো প্রভাব বিবেচনা না করে প্রশাসন ও কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে নিরপেক্ষ তদন্ত করা হোক। অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
দুটি লাইসেন্স বাতিলের দাবি কৃষকদের
স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, সানোয়ার দুটি সার বিক্রির লাইসেন্সের মাধ্যমে ব্যবসা পরিচালনা করছেন। তাদের দাবি, তদন্তে যদি ভেজাল বা নিম্নমানের সার বিক্রির অভিযোগ প্রমাণিত হয়, তাহলে তার দুটি লাইসেন্স বাতিল করা হোক।
একই সঙ্গে কৃষকদের দাবি, সার ব্যবসার কথিত সিন্ডিকেট ও ভেজালমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করে যোগ্য ও সৎ নতুন ব্যবসায়ীকে লাইসেন্স দেওয়া হোক। এতে কৃষকরা ন্যায্যমূল্যে মানসম্মত সার পাবেন এবং ফসল উৎপাদনে ঝুঁকি কমবে বলে মনে করছেন তারা।
প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা
এ ঘটনায় সাটুরিয়া উপজেলা প্রশাসন, কৃষি বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন স্থানীয় কৃষকরা। তারা জান্না বাজারে বিক্রি হওয়া সার নমুনা সংগ্রহ করে সরকারি পরীক্ষাগারে পরীক্ষা, প্রকৃত মান যাচাই এবং অভিযোগের সত্যতা পেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
কৃষকদের ভাষ্য, সার কৃষি উৎপাদনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ। নিম্নমানের সার কৃষকের হাতে তুলে দিয়ে কেউ যেন তাদের কষ্টের অর্থ নিয়ে যেতে না পারে, সে জন্য নিয়মিত বাজার তদারকি ও অভিযান জোরদার করা প্রয়োজন।
এখন কৃষকদের মূল প্রশ্ন—জান্না বাজারে বিক্রি হওয়া কথিত নিম্নমানের সার সত্যিই ভেজাল কি না এবং অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে দায়ী ব্যক্তির বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে?
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও কৃষি বিভাগের বক্তব্য পাওয়া গেলে পরবর্তী প্রতিবেদনে তা তুলে ধরা হবে।