
বুলবুল হোসেন, তারাগঞ্জ (রংপুর) প্রতিনিধি:
আজ বিশ্ব শিক্ষক দিবস। অন্য সব দিনের মতো সকালেই মাদ্রাসায় এসেছেন তারা। পেটে ক্ষুধা, মাথায় সংসারের চিন্তা—তবুও শ্রেণিকক্ষে দাঁড়িয়ে পাঠদান করাচ্ছেন। শিক্ষার্থীদের খাতা দেখছেন, পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। দিনের শেষে ফিরছেন বাড়িতে। কিন্তু মাস শেষে হাতে আসে না কোনো বেতন।এভাবে এক-দুই বছর নয়, কেটে গেছে দীর্ঘ ৩৩ টি বছর।
রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার কুর্শা ইউনিয়নের ঘনিরামপুর আলহুদা আদর্শ দাখিল মাদ্রাসার ১৪ শিক্ষক ও ৪ কর্মচারীর জীবন যেন বেতনহীন এক দীর্ঘ কর্মজীবনের গল্প। সংসারের খরচ, সন্তানের পড়াশোনা, চিকিৎসা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয়—সবকিছুর সঙ্গে লড়াই করে বছরের পর বছর দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন তারা। কেউ চাকরি ছেড়ে যেতে পারছেন না, আবার চাকরিতে থেকেও নিয়মিত কোনো বেতন-ভাতা পাচ্ছেন না।
প্রতিষ্ঠান সূত্রে জানা যায়, ১৯৯৩ সালে মাদ্রাসাটি প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৯৬ সালের ১ জানুয়ারি পাঠদানের অনুমতি এবং ১৯৯৭ সালের ১ জানুয়ারি একাডেমিক স্বীকৃতি পায় প্রতিষ্ঠানটি। পরবর্তীতে ২০০০ সালে মাদ্রাসাটি এমপিওভুক্ত হয়।
তবে হালনাগাদ স্বীকৃতি না থাকার কারণে ২০০১ সালে প্রতিষ্ঠানটির এমপিও স্থগিত করা হয়। এরপর দীর্ঘ ৩৩ বছরেও সেই এমপিও আর ফিরে আসেনি। অথচ বন্ধ হয়নি পাঠদান। প্রতিদিনই শিক্ষক-কর্মচারীরা দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন।
৫ অক্টোবর সরেজমিনে দেখা যায়, মাদ্রাসাটিতে নিয়মিত শ্রেণি কার্যক্রম চলছে। শিক্ষার্থীর সংখ্যা তুলনামূলক কম হলেও প্রতিবছর দাখিল পরীক্ষায় শিক্ষার্থীরা অংশগ্রহণ করছে এবং সন্তোষজনক ফলাফল করছে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ।এমপিও ফিরে পাওয়ার আশায় ২০১৫ সালে মহামান্য হাইকোর্টে মামলা করে প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ। মামলাটির নম্বর ১১৩৯২/১৫। কর্তৃপক্ষের দাবি, ২০১৯ সালের ১৬ জুলাই মামলাটির রায় প্রতিষ্ঠানের পক্ষে আসে। পরে সরকার পক্ষ আপিল করে। সর্বশেষ ২০২৬ সালের ২২ এপ্রিল প্রকাশিত পূর্ণাঙ্গ রায়ও প্রতিষ্ঠানের পক্ষে হয়েছে বলে দাবি তাদের। তাদের ভাষ্য, স্থগিত এমপিও পুনর্বহালের ক্ষেত্রে ওই রায়ে কোনো বাধা নেই।
তবুও এখনো এমপিও ফিরে না পাওয়ায় শেষ হয়নি শিক্ষক-কর্মচারীদের অপেক্ষা।
মাদ্রাসার সহকারী সিনিয়র শিক্ষক মো. হাফিজুর রহমান বলেন, “আমরা ৩৩ বছর ধরে বিনা বেতনে পাঠদান করে যাচ্ছি। আমাদের দেখার কেউ নেই। অনেক কষ্টে জীবনযাপন করছি। বছরের পর বছর দায়িত্ব পালন করেও যখন মাস শেষে কোনো বেতন পাই না, তখন নিজের পরিবার চালানোই কঠিন হয়ে পড়ে।”
ইবতেদায়ী কারী শিক্ষক সাইফুল ইসলাম বলেন, “আমার তিনটা মেয়ে। অভাবের সংসার। শিক্ষকতা করে কোনো বেতন পাই না। সংসারের খরচ চালাতে ক্লাস শেষ করে অন্যের বাড়িতে কামলা দিতে যেতে হয়। সারাদিন ছাত্র পড়াই, আর বিকেলে নিজের সংসারের জন্য শ্রমিকের কাজ করি।”কথা বলতে বলতে আবেগাপ্লুত হয়ে তিনি বলেন, “একজন শিক্ষক হিসেবে ছাত্রদের সামনে দাঁড়িয়ে পড়াই, তাদের ভালো মানুষ হওয়ার শিক্ষা দিই। কিন্তু ক্লাস শেষ করে যখন অন্যের বাড়িতে কামলা দিতে যাই, তখন নিজের কাছেই নিজেকে খুব অসহায় মনে হয়। মেয়েদের মুখের দিকে তাকালে কষ্ট আরও বেড়ে যায়। তারা কী খাবে, কীভাবে পড়াশোনা করবে—সেই চিন্তায় রাতের ঘুমও হারাম হয়ে যায়। ৩৩ বছর ধরে এভাবে চলছি। আমরা কি কোনোদিন আমাদের শ্রমের মূল্য পাব না?”
মাদ্রাসার সুপারিনটেনডেন্ট মো. ওবায়দুল্লাহ বলেন, “২০০১ সালে হালনাগাদ স্বীকৃতি না থাকার কারণে আমাদের এমপিও স্থগিত হয়। বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘদিন মামলা চলেছে। সর্বশেষ ২২ এপ্রিল ২০২৬ সালে প্রতিষ্ঠানের পক্ষে রায় হয়েছে। স্থগিত এমপিও ফিরে পেতে কোনো বাধা নেই।”
তিনি আরও বলেন, “গত ৩৩ বছর ধরে আমরা শিক্ষক-কর্মচারীরা এমপিওহীন অবস্থায় করুণ জীবনযাপন করছি। আমাদের অনেকেরই চাকরিজীবনের বড় একটা সময় চলে গেছে। এমপিও ফিরে পেলে শিক্ষক-কর্মচারীদের পরিবারগুলো অন্তত একটু স্বস্তি পাবে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সদয় দৃষ্টি কামনা করছি।”
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার( ভারপ্রাপ্ত) শাহীনুর রহমান বলেন, “ঘনিরামপুর আলহুদা আদর্শ দাখিল মাদ্রাসাটি ১৯৯৭ সাল থেকে দাখিল পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে প্রতিবছর শিক্ষার্থীরা উত্তীর্ণ হয়ে আসছে। আমার জানা মতে, প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হচ্ছে। আমি প্রতিষ্ঠানটির উত্তরোত্তর সাফল্য কামনা করি।”
একটি প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে ১৮টি পরিবারের স্বপ্ন, অপেক্ষা আর অনিশ্চয়তা। কেউ সন্তানের পড়াশোনার খরচ জোগাতে হিমশিম খাচ্ছেন, কেউ চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে পারছেন না, আবার কেউ শিক্ষকতার পাশাপাশি জীবিকা নির্বাহের জন্য অন্যের বাড়িতে শ্রম দিচ্ছেন।
বিশ্ব শিক্ষক দিবসে যখন শিক্ষকতার মর্যাদা ও অধিকার নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, তখন ঘনিরামপুর আলহুদা আদর্শ দাখিল মাদ্রাসার ১৮ শিক্ষক-কর্মচারীর প্রশ্ন—৩৩ বছর পাঠদান ও অপেক্ষার পর তাদের এমপিও পুনর্বহালের দিন কি আদৌ আসবে?