
প্রবাহ নিউজ টিভি |
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বাড়ছে, কিন্তু সেই বাড়তি বেতন পরিশোধের অর্থের জোগান দিতে গিয়ে ব্যাংকঋণের দিকে আরও ঝুঁকছে সরকার। নতুন পে-স্কেলের বেতন ও বকেয়া পরিশোধে অতিরিক্ত ৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার উদ্যোগ ঘিরে সামনে এসেছে সরকারের রাজস্ব আদায় ও ব্যয় ব্যবস্থাপনার বড় চ্যালেঞ্জ।
২৮ অক্টোবর প্রকাশিত বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নতুন বেতনকাঠামো অনুযায়ী সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ও বকেয়া পরিশোধের বাড়তি অর্থের প্রয়োজন মেটাতে ব্যাংক খাত থেকে ৫ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক ১৪ দিন মেয়াদি বিশেষ ট্রেজারি বিলের নিলাম আহ্বান করেছে।
কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাড়ানোর পাশাপাশি সেই ব্যয় নির্বাহের আর্থিক সক্ষমতা কতটা নিশ্চিত করতে পারছে সরকার?
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর—এই তিন মাসে ব্যাংক খাত থেকে সরকারের নিট ঋণ দাঁড়িয়েছে ২৪ হাজার ২৪৫ কোটি টাকা। আর অক্টোবরের ২৭ তারিখ পর্যন্ত ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মাধ্যমে মোট ৫৫ হাজার ৩০০ কোটি টাকা সংগ্রহ করেছে সরকার। নতুন ৫ হাজার কোটি টাকার নিলাম সম্পন্ন হলে অক্টোবর মাসে মোট সংগ্রহ দাঁড়ানোর কথা ৬০ হাজার ৩০০ কোটি টাকা।
অন্যদিকে, রাজস্ব আদায়ের চিত্রও স্বস্তিদায়ক নয়। অর্থবছরের প্রথম দুই মাসেই জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি হয়েছে ২৫ হাজার ৪৯১ কোটি টাকা। ফলে উন্নয়ন ব্যয়, প্রশাসনিক ব্যয়, বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সরকারি দায় মেটাতে অর্থের সংস্থান নিয়ে বাড়ছে চাপ।
নতুন পে-স্কেলের আর্থিক হিসাব আরও বড়। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত অর্থ বিভাগের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, নতুন মূল বেতন বাস্তবায়নে চলতি অর্থবছরে প্রয়োজন হতে পারে ৩৭ হাজার ৩৭২ কোটি টাকা। আর নতুন বেতন ও ভাতার কাঠামো পুরোপুরি কার্যকর হলে সরকারের বার্ষিক ব্যয় বাড়তে পারে প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা।
এদিকে, অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর প্রান্তিকে ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মাধ্যমে ব্যাংক খাত থেকে নিট ৩০ হাজার ১০৭ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনার কথাও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
অর্থনীতিবিদদের উদ্বেগের জায়গা হলো, রাজস্ব আয় না বাড়িয়ে সরকারি ব্যয় ধারাবাহিকভাবে বাড়ানো হলে ঋণের চাপ আরও বাড়তে পারে। ব্যাংকঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা সরকারের সুদ পরিশোধের ব্যয়ও বাড়িয়ে দিতে পারে।
তবে সরকারি কর্মচারীদের জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনায় বেতন বৃদ্ধি গুরুত্বপূর্ণ হলেও প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে—রাজস্ব আয় না বাড়িয়ে ঋণের ওপর নির্ভর করে বাড়তি ব্যয় কতটা দীর্ঘমেয়াদে সামাল দেওয়া সম্ভব?
সব মিলিয়ে নতুন পে-স্কেল সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আয় বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি করলেও এর অর্থায়ন, রাজস্ব ঘাটতি এবং ব্যাংকঋণের ওপর ক্রমবর্ধমান নির্ভরতা সরকারের সামনে বড় অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—ঋণনির্ভরতা বাড়িয়ে কতদিন চলবে রাষ্ট্রের ব্যয়ের চাকা? নতুন বেতনকাঠামোর বিশাল আর্থিক চাপ সামাল দিতে সরকার কতটা রাজস্ব আয় বাড়াতে পারবে?