
মোহাম্মদ হানিফ,সহব্যুরো প্রধান, চট্টগ্রাম বিভাগ
ফেনী সদর উপজেলার ধর্মপুর ইউনিয়নের বাঁশতলা এলাকায় স্বামীর নিষেধ অমান্য করে ভোট দেওয়ার জেরে গৃহবধূ বিবি জহুরাকে মৌখিক তিন তালাক দেওয়ার ঘটনায় এলাকায় তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। সামাজিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় মহলে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার মধ্যেই এখন অনিশ্চয়তায় রয়েছে তিন সন্তানের জননী জহুরার ভবিষ্যৎ। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা থেকে ফেনী সদর উপজেলার ধর্মপুর এলাকার ওই বাড়িতে স্থানীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যক্তিদের ভিড়ে পরিস্থিতি ঘোলাটে হয়ে ওঠে। ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় উত্তেজনাও ছড়িয়ে পড়ে।
তালাকের ঘটনা ও জনতার ক্ষোভ
অভিযোগ উঠেছে, ধর্মপুর ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ড স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি ইসমাইল হোসেন কাওসার বুধবার বিকেলে স্ত্রীকে ভোটকেন্দ্রে যেতে নিষেধ করেন। কিন্তু জীবনের প্রথম ভোট দেওয়ার আগ্রহে জহুরা বুধবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে তিন সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ‘ধানের শীষ’ প্রতীকে ভোট দেন। বিকেলে বিষয়টি জানতে পেরে মাগরিবের সময় বাড়ির পাশের রাস্তায় প্রকাশ্যে স্ত্রীকে মৌখিক তিন তালাক দেন কাওসার। এ সময় তাকে ঘরে প্রবেশেও বাধা দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় লোকজন ক্ষুব্ধ হয়ে কাওসারকে আটক ও মারধর করে। পরে স্ত্রীকে দেওয়া তালাক ফিরিয়ে নেবেন বলে আশ্বাস দিয়ে তিনি সরে যান।
রাজনৈতিক নেতাদের উপস্থিতি
ঘটনার পর শুক্রবার সন্ধ্যায় জহুরার সঙ্গে দেখা করতে যান বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর নেতারা। দলটির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মশিউর রহমান বিপ্লব, ফেনী পৌরসভা বিএনপির সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট মেজবাহ উদ্দিন ভূঁঞা এবং ধর্মপুর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট আবদুস সাত্তার স্থানীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে জহুরা ও তার পরিবারের সঙ্গে কথা বলেন। এ সময় নেতারা জানান, জহুরার এই দুঃসময়ে বিএনপি তার পাশে থাকবে। সংসার পুনঃস্থাপন, পরিচালনা এবং সন্তানদের ভরণপোষণে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার আশ্বাসও দেওয়া হয়।
স্বামীর অনুশোচনা, সমাধানের ইঙ্গিত
জনতার তোপের মুখে এলাকা ছাড়লেও শুক্রবার দুপুরে বাড়িতে ফিরে আসেন কাওসার। স্থানীয়দের চাপের মুখে নিজের ভুল স্বীকার করে তিনি জানান, একজন মুফতির পরামর্শ নিয়ে ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী স্ত্রীকে নিয়ে পুনরায় সংসার করতে চান। তবে তালাক ঘোষণার পর থেকেই জহুরা তার শাশুড়ি ও তিন সন্তান নিয়ে শ্বশুরের বাড়িতেই অবস্থান করছেন।
স্ত্রীর মর্যাদা না দিলে ঘরে ঠাঁই নয়
কাওসারের মা শরীফা খাতুন বলেন, ছেলে অপরাধ করেছে এবং তাকে শাস্তি পেতে হবে। ঘরে ফিরতে হলে স্ত্রী-সন্তানদের নিয়েই থাকতে হবে। জহুরাকে স্ত্রীর মর্যাদা না দিলে তাকে আর পিতার ঘরে জায়গা দেওয়া হবে না বলেও তিনি জানান।
জহুরার বক্তব্য
জহুরা জানান, জীবনের প্রথম ভোট দিতে পেরে তিনি আনন্দিত ছিলেন। কিন্তু সেই ভোটই তার জীবনে সংকট ডেকে আনে। তিনি ধর্মীয় ও সামাজিকভাবে সমাধান চান এবং স্বামীর সংসারেই থাকতে আগ্রহী বলে জানান। অর্থনৈতিক অনটনের কারণে তিনি বিভিন্ন বাড়িতে কাজ করে সংসার চালাতেন বলেও জানা গেছে।
অতীতের অভিযোগ
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা দাবি করেন, বিয়ের পর থেকেই কাওসার স্ত্রীকে মারধর করতেন এবং বিষয়টি নিয়ে একাধিকবার সামাজিক বিচার হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে কাওসারের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। উল্লেখ্য, ২০১৩ সালে ফেনী সদর উপজেলার মধুয়াবাজার এলাকার নুর আহম্মদের মেয়ে বিবি জহুরার সঙ্গে কাওসারের বিয়ে হয়। তাদের সংসারে তিন সন্তান রয়েছে। কাওসার ফেনী শহরের রেলগেট এলাকায় বেডিং কারিগর হিসেবে কাজ করতেন। একটি ভোটকে কেন্দ্র করে একটি পরিবারে এমন সংকট সৃষ্টি হওয়ায় এলাকায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। ধর্মীয় বিধান, সামাজিক রীতি এবং রাজনৈতিক অবস্থানের টানাপোড়েনে এখন প্রশ্ন—জহুরার সংসার পুনরায় টিকবে কি না।
Probaho News24 — প্রবাহিত হোক তথ্য, উন্মোচিত হোক সত্য।