
কুড়িগ্রামে আধুনিক হাঁস পালন সম্প্রসারণে জোরালো সচেতনতামূলক কার্যক্রম, নতুন উদ্যোক্তাদের আগ্রহ বাড়ছে
মো. আব্দুল আজিজ মিয়া |
কুড়িগ্রামে প্রাণিসম্পদ খাতকে আরও উৎপাদনশীল, লাভজনক ও টেকসই করে গড়ে তুলতে আধুনিক হাঁস পালন সম্প্রসারণে বহুমুখী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগ। উন্নত জাতের হাঁস পালন, বৈজ্ঞানিক খামার ব্যবস্থাপনা, রোগ প্রতিরোধ, সুষম খাদ্য ব্যবস্থাপনা এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির বিষয়ে খামারিদের সচেতন করতে মাঠপর্যায়ে ধারাবাহিকভাবে প্রচারণা, প্রশিক্ষণ, মতবিনিময় সভা, পরামর্শ প্রদান, তথ্যপত্র বিতরণ এবং সচেতনতামূলক স্টিকার প্রদর্শন করা হচ্ছে। এসব কার্যক্রমে জেলার বিভিন্ন এলাকার খামারি ও নতুন উদ্যোক্তাদের মধ্যে ইতিবাচক সাড়া মিলছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, কুড়িগ্রামের বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল, নদী, বিল ও জলাভূমি হাঁস পালনের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। এ প্রাকৃতিক সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে প্রাণিজ আমিষ উৎপাদন বৃদ্ধি, গ্রামীণ কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং খামারভিত্তিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণের লক্ষ্যে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর হাঁস পালনকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
কর্মকর্তারা জানান, প্রচলিত পদ্ধতির পরিবর্তে বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনায় হাঁস পালন করলে উৎপাদন বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি রোগবালাই উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। এ কারণে খামারিদের হাতে-কলমে পরামর্শ দেওয়ার পাশাপাশি আধুনিক ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে নিয়মিত উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে।
সদর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ের সিনিয়র সহকারী পরিচালক ডাঃ মো. রুবাইয়েত রেজার তত্ত্বাবধানে পরিচালিত বিভিন্ন কর্মসূচির আওতায় উন্নত জাত নির্বাচন, মানসম্মত খাদ্য ব্যবহার, খামারের স্বাস্থ্যবিধি, বাচ্চা লালন-পালন, টিকাদান কর্মসূচি, রোগ প্রতিরোধ এবং উৎপাদন ব্যবস্থাপনা বিষয়ে খামারিদের বাস্তবভিত্তিক পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে খামার পরিদর্শনের মাধ্যমে বিভিন্ন সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধান এবং প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তাও প্রদান করা হচ্ছে।
প্রাণিসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তাদের মতে, বর্তমানে জেলার অনেক শিক্ষিত তরুণ, প্রবাসফেরত যুবক এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা হাঁস পালনকে সম্ভাবনাময় আয়ের উৎস হিসেবে বিবেচনা করছেন। সরকারি কারিগরি সহায়তা, পরামর্শ ও সচেতনতামূলক কার্যক্রমের কারণে তাঁদের আগ্রহ ক্রমেই বাড়ছে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে হাঁস পালন করে আসা খামারিরাও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে উৎপাদন বৃদ্ধি এবং খামারকে আরও লাভজনক করার উদ্যোগ নিচ্ছেন।
মাঠপর্যায়ে খামারিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নিয়মিত টিকাদান, উন্নত জাত নির্বাচন, পুষ্টিকর খাদ্য সরবরাহ এবং পরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিশ্চিত করার ফলে হাঁসের মৃত্যুহার কমেছে। অনেক খামারির দাবি, আগের তুলনায় ডিম ও মাংস উৎপাদনও বৃদ্ধি পেয়েছে, যার ফলে অর্থনৈতিকভাবে তাঁরা লাভবান হচ্ছেন।
স্থানীয় কয়েকজন খামারি বলেন, প্রাণিসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তারা নিয়মিত মাঠে এসে খামারের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করেন এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেন। এতে রোগবালাই মোকাবিলা, খাদ্য ব্যবস্থাপনা এবং উৎপাদন বৃদ্ধির বিষয়ে তাঁদের জ্ঞান ও দক্ষতা বৃদ্ধি পেয়েছে।
এলাকার কয়েকজন বাসিন্দার ভাষ্য, সরকারি দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি ডাঃ মো. রুবাইয়েত রেজা নিয়মিত ইউনিয়ন ও গ্রাম পর্যায়ে গিয়ে খামারি এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। হাঁস, মুরগি ও গবাদিপশু পালনে আধুনিক পদ্ধতি সম্পর্কে সচেতনতা তৈরিতে তাঁর উদ্যোগ প্রাণিসম্পদ খাতের উন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে বলে তাঁদের অভিমত।
জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তারা বলেন, নিরাপদ ও লাভজনক হাঁস পালন নিশ্চিত করতে উন্নত জাত নির্বাচন, মানসম্মত খাদ্য ব্যবহার, সময়মতো টিকাদান, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং রোগ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের কোনো বিকল্প নেই। এসব বিষয়ে খামারিদের দক্ষতা বাড়াতে মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
তাঁরা আরও জানান, সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মসূচির সঙ্গে খামারিদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে কুড়িগ্রামে হাঁস পালন শিল্প আরও বিকশিত হবে। এতে স্থানীয় পর্যায়ে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, নারীর অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ বৃদ্ধি, গ্রামীণ অর্থনীতির গতিশীলতা এবং দেশের প্রাণিজ আমিষ উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা সম্ভব হবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারি উদ্যোগ, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং খামারিদের আন্তরিক প্রচেষ্টার সমন্বয় ঘটলে কুড়িগ্রাম ভবিষ্যতে উত্তরাঞ্চলের অন্যতম সম্ভাবনাময় হাঁস উৎপাদন অঞ্চল হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।