
নিজস্ব প্রতিবেদক
রাস্তা সম্প্রসারণের আড়ালে গাছ কাটার অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর কেউই জানে না কিছু—স্থানীয়দের ক্ষোভ, প্রশাসনের তদন্তের আশ্বাস ফেনী সদর উপজেলার ৯নং লেমুয়া ইউনিয়নে প্রায় ৩০ লাখ টাকার সরকারি গাছ টেন্ডার ছাড়াই কেটে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, প্রভাবশালী একটি মহলের যোগসাজশে এই গাছগুলো রাতারাতি উধাও করা হয়েছে, যা এলাকায় চরম ক্ষোভ ও উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
স্থানীয় সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘রংধনু ক্লাব’-এর সভাপতি শামছু উদ্দিন চৌধুরী মানিক জানান, ২০০৩ সালে সংগঠনের উদ্যোগে লেমুয়া স্টীল ব্রিজ (নতুন ব্রিজ) সংলগ্ন এলাকা থেকে লেমুয়া ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ হাসপাতাল পর্যন্ত রাস্তার দুই পাশে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির মাধ্যমে গাছগুলো লাগানো হয়। দীর্ঘ বছর ধরে বেড়ে ওঠা এসব গাছ এখন বড় সম্পদে পরিণত হয়েছিল।
সম্প্রতি লেমুয়া ব্রিজ থেকে ধলিয়া ইউনিয়নের মমতাজ মিয়ার হাট পর্যন্ত সড়ক সম্প্রসারণ কাজের উদ্বোধন করেন ফেনী-২ আসনের সংসদ সদস্য অধ্যাপক জয়নাল আবেদীন ভিপি। উদ্বোধনের পরপরই কোনো ধরনের সরকারি টেন্ডার ছাড়াই গাছগুলো কেটে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, জামাত সংশ্লিষ্ট কয়েকজন নেতা ও তাদের সহযোগীরা—যাদের মধ্যে সৈয়দ কামরুল ইসলাম পিংকু, আবদুল কাদের, আজিজুল হক ও মফিজুল হকের নাম উল্লেখ করা হচ্ছে—এই ঘটনায় জড়িত থাকতে পারেন বলে অভিযোগ উঠেছে। যদিও এ বিষয়ে তাদের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
রংধনু সাংস্কৃতিক সংগঠনের কোষাধ্যক্ষ নিজাম উদ্দিন জানান, “এই গাছগুলো আমরা নিজেরা লাগিয়েছি, অথচ এখন কিছু লোক ব্যক্তিগত মালিকানা দাবি করে সেগুলো কেটে নিয়ে যাচ্ছে—এটা অত্যন্ত দুঃখজনক।”
এদিকে, লেমুয়া ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি শাহ আলম মিয়াজি বলেন, “গাছগুলো ব্যক্তি মালিকানার বলে কেটে নেওয়া হয়েছে বলে শুনেছি, তবে টেন্ডার ছাড়া কাটা হয়েছে বলেও জানা গেছে।”
লেমুয়া ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার নান্টু কুমার দাস জানান, “গাছগুলো স্বাস্থ্য বিভাগের জায়গায় ছিল। গাছ কাটার বিষয়ে আমরা কিছুই জানতাম না। অফিসে এসে দেখি গাছ নেই।” এ বিষয়ে বন বিভাগ, সড়ক বিভাগ, এলজিইডি—কোনো দপ্তরেই টেন্ডারের তথ্য পাওয়া যায়নি। ফেনী সদর উপজেলা সামাজিক বন বিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তা বাবুল চন্দ্র ভৌমিক বলেন, “আমাদের দপ্তর থেকে এ ধরনের কোনো টেন্ডার দেওয়া হয়নি।”
লেমুয়া ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত প্রশাসক জসিম উদ্দিন জানান, “কারা গাছ কেটেছে তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। আমরা গাছ জব্দ করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেব।” সদর উপজেলা নির্বাহী প্রকৌশলী দ্বীপ্ত দাস গুপ্ত বলেন, “টেন্ডারের কোনো তথ্য আমাদের কাছে নেই। তবে বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।” পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের সহকারী পরিচালকও নিশ্চিত করেছেন যে, স্বাস্থ্য বিভাগের জমির গাছ কেটে নেওয়া হয়েছে, কিন্তু কোনো দপ্তর থেকে টেন্ডার দেওয়া হয়েছে কিনা তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। সরকারি সম্পদ এভাবে কারা লুটে নিচ্ছে? কেন কোনো দপ্তর জানে না? দ্রুত তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।লেমুয়ায় গাছ কাটার এই ঘটনা শুধু আর্থিক ক্ষতিই নয়, বরং পরিবেশ ও আইনের শাসনের ওপর বড় ধরনের আঘাত। এখন দেখার বিষয়—প্রশাসনের আশ্বাস বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়।