
স্টাফ রিপোর্ট,আবু বক্কর ছিদ্দিক, ফেনী
দীর্ঘ প্রায় তিন বছর ধরে চলা বহুল আলোচিত ও আলোড়ন সৃষ্টিকারী একটি সাজানো ধর্ষণ চেষ্টা মামলায় অবশেষে সকল আসামিকে বেকসুর খালাস দিয়েছেন ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল আদালত। বুধবার (০৮ জানুয়ারি ২০২৬ ইং) মামলার দীর্ঘ শুনানি, সাক্ষ্যগ্রহণ ও উপস্থাপিত প্রমাণ পর্যালোচনা শেষে আদালত এ রায় ঘোষণা করেন। মামলার বিবরণে জানা যায়, ২০২৩ সালে জাল কবির গংয়ের প্ররোচনায় বাদী হাজেরা আক্তার একটি সাজানো ও মিথ্যা ঘটনার আশ্রয় নিয়ে ফেনীর নারী ও শিশু আদালতে কমপ্লেন নং-১৪২/২৩ দায়ের করেন। পরবর্তীতে ওই অভিযোগের ভিত্তিতে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন মামলা নং-১৬৩/২৩ হিসেবে মামলা রুজু হয়। মামলায় সাইফুল ইসলাম, মো. নেজাম উদ্দিন, আবদুল কাইয়ুম ও আবদুল মালেককে আসামি করা হয়। আদালতের নির্দেশে ফেনী পুলিশের ভিকটিম সাপোর্ট সেলের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মামলাটি তদন্ত করেন। তদন্ত শেষে তিনি দণ্ডবিধির ১০/৩০ ধারায় প্রতিবেদন দাখিল করলে আদালত অভিযোগ আমলে নিয়ে আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন।
তবে গ্রেফতার প্রক্রিয়া নিয়ে মামলাটি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। আদালত থেকে ওয়ারেন্ট থানায় পৌঁছানোর আগেই ওয়ারেন্টের একটি ফটোকপি ব্যবহার করে ফেনী আদালত গেইট থেকে র্যাবের এক কর্মকর্তার মাধ্যমে আসামি সাইফুল ইসলামকে গ্রেফতার করে র্যাব কার্যালয়ে নেওয়া হয়। এ ঘটনায় শতাধিক এলাকাবাসী ফেনীর মহিপাল র্যাব অফিসে উপস্থিত হলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ওয়ারেন্ট কার্যকরের এই অনিয়মকে কেন্দ্র করে ফেনীর পুলিশ সুপার ও র্যাব কর্মকর্তাদের মধ্যে বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এক পর্যায়ে তৎকালীন পুলিশ সুপারের নির্দেশে দ্রুত ওয়ারেন্ট থানায় প্রেরণ করা হয় এবং সাইফুল ইসলামকে ফুলগাজী থানায় হস্তান্তরের নির্দেশ দেওয়া হয়। পরে ওসি আবুল হাসিমের মাধ্যমে তাকে আদালতে সোপর্দ করা হয়। সাইফুল ইসলাম দীর্ঘ ২১ দিন কারাভোগের পর জামিনে মুক্তি পান। এদিকে, এই মামলার এক বছর পর একই বাদী হাজেরা আক্তার ও জাল কবির গং আরও ভয়ংকর একটি ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয় বলে তদন্তে উঠে আসে। জাল কবির তার ভাই আবদুর রহমানের স্ত্রী মনোয়ারা আক্তারের সঙ্গে আপোষে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করে ছাগলনাইয়া উপজেলার শহীদ মিনারের দক্ষিণ পাশে একটি ভাড়া বাসায় সাজানো গণধর্ষণের ঘটনা তৈরি করে। ওই ঘটনায় স্থানীয় সাতজন নিরীহ ব্যক্তির বিরুদ্ধে ছাগলনাইয়া থানায় গণধর্ষণ মামলা দায়ের করা হয়।
উক্ত মামলায় আসামিরা দীর্ঘ এক বছর কারাভোগ করেন। পরবর্তীতে সিআইডির ফরেনসিক পরীক্ষার প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে উঠে আসে যে, আসামিদের বিরুদ্ধে ধর্ষণের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। তদন্তে জাল কবিরকেই ওই মামলার মূল হোতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। তদন্ত কর্মকর্তা জাল কবিরকে গ্রেফতারের জন্য অভিযান চালালে তার লোকজন পুলিশের ওপর হামলা চালায় এবং পুলিশের হ্যান্ডকাপ ছিনিয়ে নিয়ে জাল কবির পালিয়ে যায়। এ ঘটনায় ঘটনাস্থল থেকে ছয়জনকে গ্রেফতার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই দুটি মামলার কোনো মামলাতেই বাদী হাজেরা আক্তারের পিতা বা স্বামীর কোনো আত্মীয় সাক্ষী হিসেবে হাজির হননি। বরং সাক্ষী হিসেবে হাজির করা হয় জাল কবির ও তার অনুসারীদের। দীর্ঘ শুনানি ও নথিপত্র পর্যালোচনা শেষে আদালত ধর্ষণ চেষ্টা ও গণধর্ষণ—উভয় মামলার অভিযোগকে মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে উল্লেখ করে সকল আসামিকে বেকসুর খালাস প্রদান করেন। রায়ে আদালত বলেন, অভিযোগের স্বপক্ষে নির্ভরযোগ্য ও গ্রহণযোগ্য কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি। মামলাগুলো সম্পূর্ণ সাজানো ও অসৎ উদ্দেশ্যে দায়ের করা হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়েছে। রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে খালাসপ্রাপ্ত আসামিদের পরিবার বলেন, আমরা ন্যায়বিচার পেয়েছি। দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক অপমান ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছিলাম। আজ আদালতের রায়ে সত্যের জয় হয়েছে। এই রায়ের মাধ্যমে আবারও প্রমাণিত হলো—মিথ্যা মামলার মাধ্যমে নিরীহ মানুষকে হয়রানি করা হলেও শেষ পর্যন্ত ন্যায়বিচারের কাছে মিথ্যা টিকে না।
Probaho News24 — প্রবাহিত হোক তথ্য, উন্মোচিত হোক সত্য।
“© 2025 Probaho News tv. All rights reserved.
Address: Zirani, Ashulia, Savar, Dhaka – 1349
Email:
probahonewstv@gmail.com
Ad Contact: +8801888788988”